জান্তা-আরাকান আর্মি তীব্র সংঘাত, বিকট শব্দে কাপছে টেকনাফ সীমান্ত

মোহাম্মদ সোহেল ,৪ জুলাই, ২০২৬ (বিবিনিউজ ) : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও দেশটির বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির মাঝে আবারো দীর্ঘ বিরতির পর আবার সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়েছে।বিকট শব্দে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্ত।

আকাশে উড়ছে যুদ্ধ বিমান ও একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কাপছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তবর্তী অঞ্চল। আতংক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বিমান হামলার শব্দের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এই পর্যন্ত সীমান্ত শতভাগ সুরক্ষিত রয়েছে।

টেকনাফের জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, সীমান্তের ওইপাড় থেকে সকাল থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দ ভেসে এসেছে। ১ জুলাই রাত ১০ থেকে থেমে থেমে গোলাবর্ষণের শব্দ ভেসে আসছিল। ১২ টার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত আগুনের শিকা ও বেশ কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা গেছে। এতে স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ বেড়েছে।

মায়ানমার ভিক্তিক গণমাধ্যম দ্যা ইরাবতী সূত্রে জানাগেছে গত এক সপ্তাহ ধরে জান্তা সরকার আরকান আর্মির লক্ষ্যবস্তু টার্গেট করে ড্রোন ও বিমান হামলা চালাচ্ছে। এমনকি জনাকীর্ণ এলাকা লক্ষ্য করে ও তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আরকান আর্মি জান্তা বিরোধী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। কৌশলগত কারণে আরকান আর্মি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বলে জানাগেছে। তবে সেদেশের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবী সপ্তাহ ধরে চলমান যুদ্ধে সামরিক বেসামরিক মিলে শতাধিক লোক হতাহত হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন স্থাপনা ও বসতি জালিয়ে দিয়েছে জান্তা বাহিনী।

টেকনাফে বসবাসরত একজন পুরাতন রোহিঙ্গা কলিম উল্লাহ যিনি সার্বক্ষনিক রাখাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করেন বিভিন্ন কৌশলে।তিনি৷ এ প্রতিবেদককে জানান, দীর্ঘ ৪/৫ মাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ও হঠাৎ করে জান্তা বাহিনী আক্রমণের নয়া কৌশল গ্রহন করেছে।জলে স্থলে ও আকাশ পথে হামলার গতি বাড়িয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে গোলাবারুদ ও বোমা হামলার শব্দে আতংকিত হয়ে পড়েছে টেকনাফ সীমান্তের লোকজন।সীমান্ত ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, এ যুদ্ধের প্রভাবে সীমান্ত বানিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এমনকি টেকনাফ স্থল বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।জেলেরা নাফনদীতে মাছ ধরা নিরাপত্তা জনিত কারণে সীমিত হয়ে পড়েছে।তবে বিজিবি কোষ্টগার্ড টহল জোরদার করেছে বাংলাদেশ।
স্থানীয় এক টেকনাফের জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ শরীফ জানান, জানান, ২ জুলাই মাত্র কয়েক ঘন্টা বিরতির পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে দফায় দফায় গুলাগুলির ঘটনা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পরে যুদ্ধ বিমান থেকে বেশ কিছু বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে সংবাদ পেয়েছি। হতাহতের ব্যাপারে জানাযায়নি। তবে এই ঘটনার জের ধরে বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবার অনুপ্রবেশের জন্য বাড়িঘর ছেড়ে সীমান্ত অভিমুখে জড়ো হচ্ছে বলেও জানাগেছে।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুক মান্নান জানান, “বহুদিন পর মিয়ানমারে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে মানুষের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। অনেকে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন।

টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গতকাল রাত ৯টার দিকে মিয়ানমারের মংডু এলাকার সীমান্তের ওপারে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। ওই গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা যাচ্ছে, যার কারণে অনেক স্থানে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করতে আমি নিজেই সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি।

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ গত বছর ২৮ ডিসেম্বর চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারীর শুরুতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিলো।
মিয়ানমার জান্তা বাহিনী রাখাইন রাজ্যের ১৭ টি টাউনশীপের মধ্যে ১৪ টির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অপর তিনটি টাউন শীপ দখলের লক্ষ্যে আরকান আর্মি ধীরগতিতে এগুচ্ছে। অন্যদিকে জান্তা বাহিনী হারানো টাউনশীপের দখল নিতে মরণপণ লড়াই চালাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মিয়ানমার ২৭২ কিলোমিটার সীমান্তের পুরোটার নিয়ন্ত্রণ এখন আরকান আর্মির। বিশ্লেষকদের দাবী অনেক কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে আরকান আর্মি (এএ)।তাছাড়া বাংলাদেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চোরাচালান, মাদক পাচার, জেলে এবং সাধারণ সীমান্ত বাংলাদেশীদের ধরে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় ইত্যাদি অপকর্মে করছে আরকান আর্মি। তা ছাড়া এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থেমে থেমে গোলার শব্দ ভেসে আসছে বলে জানিয়েছে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যম্প ১৪ এর জেলে রফিক মিয়া। সে নাফনদীতে জাকিজাল নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে গিয়েছিল নাফ নদীর হোয়াইক্ষ্যং উলু বনিয়া পয়েন্টে ।দুপুর ১২ টায় পালংখালী বাজারে জাল ও কাঁধে খালী জাল নিয়ে ফিরে এসে স্থানীয় সাংবাদিক ও লোকজনকে বর্ণনা দেয় গোলাগুলির প্রচন্ড শব্দের।

Related posts

Leave a Comment